অতীত অতিথি (Otit otithi) | Arghya ch sarkar

দিনটা বড়ই বাজে আজ। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। প্যাচ প্যাচে কাদা সবজায়গায়। আমি আর ইন্দ্রনীল বসে আছি। ইন্দ্রনীল শহরের সবচেয়ে খ্যাতনামা গোয়েন্দা। তার খ্যাতি গোটা কলকাতা শহর জুড়ে। আমি কৌশিক। ইন্দ্রনীল এর সহযোগী আর বন্ধু। ইন্দ্র হটাৎ করে বললো,

 ” আজি দিনটা বড়ই কঠিন লেগেছে আকাশে মেঘ মেঘের আঁচলে ঢেকে আছে সূর্য লাগছে ভীষন বেশ”

কবিতাটা শুনে আমি ভুরু কুচকালাম। বললাম কি ব্যাপার হটাৎ করে কবি সাহিত্যিক ভাবনা কেনো। ইন্দ্র বলল,” কিছুদিন হলো কবিতা পড়া শুরু করেছি। রবীন্দ্রনাথ এর সঞ্চয়িতা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই পরছি হে। বেশ মজা লেগেছে আমার। আরো পড়বো,তাই অর্ডার দিয়েছি কিছু বই। এই আসলো বলে বইগুলো কিছুক্ষন এর মধ্যে।” আমি এদিকে ভাবনায় পড়ে গেলাম এহে এত ঘেঁটে ঘ এর ব্যাপার যে কিনা কোনোদিন সাহিত্য ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখলো না সারাদিন খালি রস হীন রসায়ন নিয়ে ব্যাস্ত থাকতো,সে কিনা আজ এই কথা বলছে,ভাবা যায়। ঠিক এসময়ে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো। ইন্দ্র বললো,”দেখলে তো মিলল কিনা আমার কথা।” অতঃপর আমি উঠে দরজা খুললাম দেখি ডেলিভারি বয় নয় তার জায়গায় একজন মধ্যবয়স্ক লোক এসেছেন। লোকটি বললেন,”আসতে পারি।” উত্তরে বললাম,”আসুন।” 

লোকটি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্র বলে উঠলো,”আপনি একজন শিক্ষক,একজন লেখক,একজন সদ্য ঘুরে আসা বিদেশ থেকে”। লোকটা বড়ই হতবাক হয়।বলে”আমি তো কিছুই বলিনি আমার ব্যাপার এ আপনি জানলেন কিভাবে এতকিছু। এত শার্লক হোমস এর মত ব্যাপার খানা অনেকটা।” ইন্দ্র হেসে বললো ” উনি আমার আইডল। ওনাকে দেখেই আমার গোয়েন্দাগিরি বা সত্যের খোঁজের শুরু”। ঘরে বসে থাকা নতুন লোকটি বললেন ” আপনি এতকিছু বুঝলেন কেমন করে,বাই দা ওয়ে আমার নাম বাপি বিশ্বাস”। “নমস্কার বাপি বাবু” । ইন্দ্র বললো 

“ব্যাপার টা খুবই সহজ। একজন শিক্ষক এর চেহারায় পাণ্ডিত্যের ভাব সর্বদাই বর্তমান আপনাকে দেখে প্রথমেই তাই মনে হয়েছে আমার আর দ্বিতীয় কথা আপনার ডান আঙ্গুল গুলোর নিচের দিকে কালসিটে পড়েছে এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে আপনি খুব বেশি লেখালেখির কাজ করেন। আর তৃতীয় টা তো আরো সহজ আপনি ঘরে ঢুকতেই প্রথমে আপনার মুখ মুছলেন রুমাল টা দিয়ে আর আপনার বুকপকেটে এ যে কলম টা দেখা যাচ্ছে দুটো বস্তুই বিদেশি বস্তু আর আপনার শরীর থেকে যে সুবাস টা পাওয়া যাচ্ছে সেটাও বিদেশি পারফিউম। তাই আপনি সদ্য বিদেশ থেকে ঘুরে আসা। কি এবার বুঝতে পারলেন তো”। বাপি বাবু হা করে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষন তারপর ইন্দ্র কে বললেন,”আপনার বিশাল পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা,মুখে শুনেছি আজ দেখেও নিলাম।” হ্যাঁ আমি সদ্য কিছুদিন হলো লন্ডন থেকে ঘুরে এসেছি।” ইন্দ্র এবারে বললো,”বলুন আপনার কীভাবে সাহায্য করতে পারি আমি।” বাপি বাবু বললেন যে,” আগে আপনাকে কথা দিতে হবে এই বিষয়ে বাইরের কেউ যাতে না জানে” বাপি বাবু একটা তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিলেন আমার উপরে। 

ইন্দ্র হেসে বলে উঠলো,” পরিচয় করিয়ে দেই এ হলো কৌশিক আমার বন্ধু আর সহযোগী যা কথা হবে ওর সমানেই হবে”।”আচ্ছা ঠিক আছে” বাপি বাবু বললেন। প্রথম থেকেই বলে রাখি আমি বনেদি বংশের সন্তান। আমার ঠাকুরদা রা ছিলেন মস্ত বড়ো জমিদার তাদের অনেক সম্পত্তি ছিল। কালের বশে আমাদের অনেকটা অবনতি হয়ে গেছে। তাই আমাদের চাকরির পথ ধরতে হয়েছে। আমি আমার বাবা মা এর একমাত্র সন্তান। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছে। সবাই এখানেই থাকে। ছেলে চাকরি করে একটা বেসরকারি কোম্পানি তে আর মেয়ে ইংলিশ অনার্স করছে। তে কিছুদিন আগেই বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান হয়। আমার ছেলে সমস্ত প্ল্যান টা করে।ছেলে নিজে যায়না ওর মা,বোন আর আমাকে যাওয়ার কথা বলে। নিজে যাবেনা কারণ ওর অফিস এর কি যেনো কাজ পড়ে গেছে। ওর ঠিক এটা অফিস এর ট্রিপ পেয়েছিল তিন জন। তাই আমরা গেলাম লন্ডন এ।

আমরা যেহেতু বনেদি বংশের সুতরাং কিছু গয়না রয়েছে। আর আছে আমার ঠাকুরদার দেওয়া এক অমূল্য আংটি। ওই আংটির একটা রহস্য আছে। আংটির গড়ন এমন ধরনের যে যে কারোর আঙ্গুল এই সেটি ফিট খায়।আংটি টি অমূল্য তার কারণ আংটি টি অমূল্য কিছু রত্ন দিয়ে তৈরি। আংটির একটা ইতিহাস আছে। আংটি টি ঠাকুরদার ঠাকুরদা পায় এক রাজার কাছে। রাজার পরামর্শ দাতা ছিলেন উনি। যুদ্ধের সময় সঠিক পরামর্শ দিয়ে রাজাকে বাঁচিয়েছিলেন জন্য তিনি এটি উপহার হিসাবে পেয়েছিলেন। এটা বড়ই অমূল্য সম্পদ আমাদের কাছে। এটা বংশ পরম্পরায় আমার ঠাকুরদা তারপর আমার বাবা এবং আমার বাবার পরে আমি পাই। এখন কার বাজারে ওই আংটির দাম মোটামুটি প্রায় এক কোটি বা তারও বেশি হতে পারে।

এখানে ব্যাপার টা হলো আমরা ঘুরতে গেছিলাম এক সপ্তাহের জন্য। এসে যখন বাড়ি ঢুকি তখন বাড়ির অবস্থা শোচনীয় সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।আর গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমরা দরজা খুললাম ঘরে ঢুকলাম,দেখলাম আমার ছেলে বান্টি চেয়ারে বসা গোঙাচ্ছে তার হাত,পা,মুখ বাঁধা হয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি ওর হাতের বাঁধন খুলে দেই। তারপর সে কেঁদে ফেলে বলে,”বাবা সর্বনাশ হয়ে গেছে বাড়িতে চোর এসেছিল,আমি রাতে জেগে উঠে শব্দ পাই তাই উঠতে যাই আর তার সঙ্গে সঙ্গে কেউ আমাকে ধরে মুখ বেঁধে দেয় তারপর জোর করে হাত পা বেঁধে দেয় চেয়ার এর সাথে।” এইকথা শোনার পর পর আমি পাগল এর মত ছুটে যাই আমার গোপন জায়গায় যেখানে আমি আমার দামী আংটি টা রাখতাম। আমি সেখানে গিয়ে দেখি আংটি টা নেই। আমার মাথায় হাত। ওই আংটি টা আমাদের বংশের একটা প্রতীকের মত। কারোর কাছে হারায়নি ওটা। ওটা আমাদের ভগ্যলক্ষি এর মত কিছুটা।

সেইজন্য আপনার কাছে আসা। আপনি যদি আংটি টা উদ্ধার করে দিতে পারেন তো আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো সারাজীবন। ইন্দ্র জিজ্ঞেসা করলো যেমন থাকার তেমনি আছে তো সবকিছু। বাপি বাবু বললেন,” হা ওরকমই আছে”। ইন্দ্র আরো বললো,” এব্যাপারে পুলিশ ভালো পারবে আমি কিজন্য”। তখন বাপি বাবু বললেন,”পুলিশ এর উপর অত ভরসা নেই আমার ওরা তিল কে তাল করতেই জানে তদন্ত ওদের কর্ম নয়।”

এরপর আমি আর ইন্দ্র যাই বাপি বাবুর সাথে বাপি বাবুর বাড়িতে। সেখানে গিয়ে ওর ছেলের সাথে কথা বলা হলো।ইন্দ্র জিজ্ঞেসা করলো আচ্ছা বান্টি বাবু চুরির দিন ঠিক কি হয়েছিলো বলুন তো।বান্টি বাবু বললেন,”আমি দশ টায় ঘুমাই। সেদিন ও তার ব্যতিক্রম হোয়নি। রাতে হটাৎ খট খট শব্দ শুনে ঘুম ভেংগে যায়। উঠে দেখতে গিয়েই কেউ যেনো আমায় ধরে ফেলে। তারপর আমার মুখ,হাত,পা বেঁধে দেয়।এরপর ওরা ওদের কাজ করে যায়”। ইন্দ্র সব দেখে নিল ঠিকমতন। এরপর কিছু না বলেই চলে এলো সেখান থেকে।

সাধারণত এরকম করেনা ওয়। বাড়ি এসে বললাম,” চলে এলে যে” ইন্দ্র বললো,” দেখার কিছুই ছিল না যদি বাপি বাবু আগেই বলতেন তাদের বাড়ির গেট লোহার তাহলে কিছুই হতনা এসব আমাকেও যেতে হতো না তাহলে।আমি বললাম কীভাবে,” দেখো এখানে কালপ্রিট হলো বাপি বাবুর ছেলে বান্টি বাবু। উনি নিজেই এটাকে চুরি হিসাবে সাজিয়েছেন। দেখো প্রথমেই চোর জানবে না লুকানো জায়গায় কথা কিন্তু শুধু আংটি চুরি গেছে।আর কিছুই যায়নি। আর আরো একটা ব্যাপার আছে। আমি যখন তার হাতের দিকে তাকাই দেখি সেখানে যে দড়ির দাগ আছে সেটা বেশিক্ষণ এর না। সুতরাং বুঝে গেলাম।”

এরপর ফোন করে বাপি বাবু কে সব বলা হলো। বাড়ির চাপ এ আর পুলিশ এর ভয়েই সব স্বীকার করলো সে।সে কোম্পানি থেকে অনেক টাকার ঘোলা করেছে টাই তার টাকার দরকার ছিল তাই সে এই কাজটা করেছে।

এই কেস এর একবছর হতে চললো। একদিন বাপি বাবু এলেন দেখা করতে আমাদের সাথে। তিনি আংটি টা দেখালেন। আংটি টা দেখে আমরাও অভিভূত। ইন্দ্র এবং আমার দুইজন এর আঙ্গুলে ঢুকে গেলো আংটি টা । বড়ই অদ্ভুত। ইন্দ্র বললো,

বিচিত্র এই বস্তু

নেই কোনো মাপ

অতীতের চাপ আছে খুব

অতীত অতিথি এটা 

এটাই আমাদের চাপ।

– অর্ঘ্য

3.7 6 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Anangsha Choudhury
Anangsha Choudhury
5 months ago

শুরু থেকেই predictable ছিল

Bakul
Bakul
5 months ago

😀😀

Prabir sarkar
Prabir sarkar
5 months ago

সুন্দর সুন্দর!