Ojanar Araale (অজানার আড়ালে) | Ayan Kar | Bengali Story

সূত্রপাত
বারো বছরের ছেলেটাকে প্রায় টানতে টানতে ঘর থেকে বারান্দায় নিয়ে এসে ছিটকে ফেলে দিলেন সুবীর মজুমদার।
ছেলেটা বারদুয়েক হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেও সেদিকে কারোরই দৃষ্টি পৌঁছলো না। সুবীরবাবুর অধীনে কাজ করা দুজন হৃষ্টপুষ্ট চেহারার লোক ছেলেটিকে পেছনের জঙ্গলের দিকে নিয়ে চললো। ছেলেটির আর্তচিৎকার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। সুজনের অশ্রুশিক্ত চোখে ক্রযশ ঝাপসা হয়ে যেতে লাগলো দৃশ্যটা…..
ফেরা
———
প্রায় ২৫ বছর হবে বোধহয়! না না সম্ভবত ২৭ বছর। শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলো সুজন। সুজন মজুমদার। কেয়ার অফ সুবীর মজুমদার। তখন বোধহয় তার চোদ্দ বছর বয়স‌। সেই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাওয়া। কতদিন হয়ে গেলো তারপর! বাড়িটা বানিয়েছিলেন সুজনের দাদুর ঠাকুরদা। তখন উত্তাল সময়। ভারতছাড়ো আন্দোলনের রেশ থেকে গেছে আকাশেবাতাসে। ১৯৪৩ সাল। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কেরানীগিরি করে বেশ ভালোই টাকা জমিয়েছিলেন মনোহরনাথ চাটুয‍্যে। শেষ বয়সে সেই টাকা দিয়ে বানিয়েছিলেন এই বাড়ি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বাড়িটাকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করতেন। স্ত্রী বছরখানেক আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত হয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে নবীনবরণের সাথে খুব একটা বনিবনা কোনোদিনই ছিলোনা মনোহরবাবুর। তাই বাড়িটাকেই সন্তানের মতো দেখতেন। মনোহরবাবুর মৃত‍্যুর পর বাড়ির একমাত্র স্বত্বাধিকারী হলো নবীনবরণ। কোনোকালেই তার উচ্চাকাঙ্খা ছিলোনা। একমাত্র নেশা বলতে ছিলো মদ‍্যপান। সে কারণেই বাবার সাথে কোনোদিনই তার বোঝাপড়া সুবিধের ছিলোনা। মদের নেশা থাকলেও পেটে বেশ ভালোই বিদ‍্যে ছিলো নবীনবরণের। শুধু তাই নয়, বিষয়জ্ঞানও বেশ পোক্ত ছিলো তার। তাই বাবার জমানো টাকা থেকে ইঁটবালির ব‍্যবসা খুলে বসলো সে। কিন্তু সফল হলো কই!সারাটাজীবন কষ্ট করেও নিজের ছেলেটাকে মনের মতো মানুষ করতে পারলোনা নবীনবরণ। ছেলে নৃপেন বাপের কাছ থেকে একটামাত্রই জিনিস অর্জন করতে পেরেছিলো, তা হলো মদ‍্যপানের নেশা। ছেলেবেলা থেকেই মদের পেছনে অকাতরে টাকা জলাঞ্জলী দিয়ে মাঝবয়েসে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে পথে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা হলো নৃপেন্ চাটুয‍্যের। তবু বিধাতা বোধহয় একটি সুযোগ তাকে দিয়েছিলেন, আর সেই সুযোগের ব‍্যবহার করেই ছোট মেয়ে নমিতার সঙ্গে বিয়ে দিলেন সুবীর মজুমদারের অর্থাৎ সুজনের বাবার। পিতৃমাতৃহীন সুবীরের সম্বল বলতে ছিলো চার পাঁচবিঘে জমি। কিন্তু সেদিকে কোনো আগ্রহ ছিলোনা সুবীরের। এক স্থানীয় প্রোমোটারের দালালি করে যা উপার্জন করতো সেই টাকাতে দিনরাত মদ গিলে এখানে সেখানে পড়ে থাকা অভ‍্যেস ছিলো তার। প্রায় নিঃস্ব নৃপেন সেই চার পাঁচ বিঘে জমির লোভে নমিতার সঙ্গে সুবীরের বিয়ে দিয়ে তাকে ঘরজামাই করে রাখলেন। যদিও বিয়ের চারদিনের মাথায় তিনি ইহলোকের মায়া ত‍্যাগ করে গত হলেন। দু’মাস বাদে স্বামীর শোকে নৃপেনের স্ত্রীও গত হলেন। বড়ো মেয়ে নীপা প্রেমে প্রত‍্যাখ‍্যাত হয়ে আত্মঘাতিনী হলো আরো দু’মাস পরে। অতএব একমাত্র বাড়িটির মালিক হলো সুবীর এবং নমিতা।
“বাবু! বাবু! শুনছেন?”
স্মৃতির অতল থেকে মাথা তুললো সুজন। ক্ষীণ কন্ঠে একটু উদাস হয়ে বললো— “কি হলো?”
রিকশাচালক একটু বিরক্ত হয়েই বললো—“আজ্ঞে আমার ভাড়াটা দিয়ে দ‍্যান। আমার তাড়া আছে।“
মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে রিকশাচালক রিকশাটা টেনে নিয়ে চললো স্টেশনের দিকে। সে দেখেই বুঝেছিলো ওই শহুরে বাবুর মাথার ব‍্যামো আছে। নইলে কেউ এই ভূতের বাড়িতে মরতে আসে! আবার রিকশা থেকে নেমে কতক্ষণ সঙ সেজে দাঁড়িয়েছিলো। নির্ঘাত পাগল! দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো।
বাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা হলো সুজনের। প্রায় কুড়িবছর আগে বন্ধ দরজা কি সহজে খোলে! পাঁচ মিনিট ধরে বিভিন্ন কসরতের পর দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে অবশেষে সশব্দে দরজাটা খুলে গেল।
দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে দুটো চামচিকে বিদ‍্যুৎবেগে বেরিয়ে এলো। বন্ধ ঘরবাড়ির রাজত্ব পেয়ে বেশ রাজকীয় ভাবে আস্তানা গেঁড়ে বসেছে ব‍্যাটারা!
হাসতে হাসতে সুজন ঘরের ভেতর ধুলোর আস্তরণের ওপর পা রাখলো। বাতাসে একটা সোঁদা গন্ধ। পুরনো বন্ধ ঘর খুললে যে গন্ধ পাওয়া যায় আর কি! এই ঘরটা পরিস্কার করে নিলেই আরামে কাটানো যাবে একটা রাত। কালকে সকালে লোক ডেকে গোটা বাড়িটা পরিস্কার করে নিতে হবে। আর রঙের কাজটা পরবর্তী দু’দিনের মধ‍্যেই সেরে ফেলতে হবে। আগামী রবিবার ছেলে পাপুনকে নিয়ে স্নিগ্ধা প্রথমবার এ বাড়িতে আসবে। তার আগেই সব গোছগাছ করে না রাখতে পারলে কি যে ঝামেলা বাধবে কে জানে!
আসবার পথে দোকান থেকে কিনে আনা নতুন ঝাঁটাটা দিয়ে ঘরটা ঝাঁট দিতে লাগলো সুজন।তারপর ব‍্যাগ থেকে মাদুরটা বের করে জুতা হয়ে বসলো তাতে। বলে কিনা ভূতের বাড়ি! কোনো একটা বাড়ি বেশিদিন ধরে বন্ধ থাকলেই তাকে ভূতের বাড়ি হতেই হবে! লোকের যে কি একটা পাগলামি!
টিফিন ক‍্যারিয়ার থেকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা রুটি আর মাংস খাওয়া শেষ করে ব‍্যাগ থেকে বোতলটা বের করে হাতমুখ ধোওয়ার জন‍্য পেছনের বারান্দায় গেল সুজন। সেই সময়ই তার চোখে পড়ল ঘরটা। আরে এই ঘরটায় তো সেই ছেলেটা থাকতো! কি যেন নামটা…মনে পড়েছে। রামু। এ বাড়ির কাজটাজ করতো। সুজনের থেকে দু’বছরের ছোট ছিলো রামু। পড়াশোনা বিশেষ করেনি। বাপ-মা সারা ছেলেকে পড়াশোনা শেখানোর প্রয়োজন বোধও করেনি কেউ। তাই সুজনদের বাড়িতে কাজ করতো রামু। এই ঘরটায় থাকতো। প্রায় কাছাকাছি বয়স  হওয়ায় সুজন আর রামুর বন্ধুত্ব ছিলো খুব। দুজনে একসাথেই বিকেলে খেলতে যেত, সুজন মাঝেমধ‍্যে তাকে পড়ানোর চেষ্টাও করতো, কিন্তু রামুর তাতে বিশেষ আগ্রহ ছিলোনা। হঠাৎ একদিন সব ওলোট পালোট হয়ে গেল। মায়ের আলমারী থেকে দুটো সোনার হার আর একটা আ্ংটি চুরি করে বসলো রামু। চুরির কথা জানতে পেরে বাবা তো রামুকে এমন মার মেরেছিল তা স্পষ্ট মনে আছে সুজনের। একটা লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি ভাবে রামুকে মারছিলো বাবা। মা একটা কথাও বলেনি, রামুকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলো। কিন্তু শুধু মেরেই ক্ষান্ত হয়নি বাবা। তার পরিচিত দু’জন গুন্ডা চেহারার লোকের হাতে তুলে দিয়েছিলো রামুকে।
ভীষণ কেঁদেছিলো সুজন। বাবাকে থামানোর চেষ্টা করলেও বাবা শোনেনি। বর্ং সুজনকেই ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল। আশ্চর্যের ব‍্যপার হলো অত মার খাবার পরেও রামু কাঁদেনি একফোঁটাও। শুধু চিৎকার করছিলো আর হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছিলো। শেষমূহুর্তে সুজন যখন দেখেছিলো যে রামুকে দুটো লোক টানতে টানতে পেছনের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেইসময়ও কোনো কান্না ছিলোনা রামুর চোখে। ছিলো অদ্ভুত এক ক্ষোভ আর ঘৃণা।
পরে বাবার কাছে সুজন শুনেছিলো রামুকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রামুকে তাড়িয়ে দেবার ঠিক দু’দিন পর সুজনেরা হাওড়ার সেই বাড়ি ছেড়ে মালদা চলে আসে। সেখানে বাবা ইলেকট্রনিক্স এর দোকান দেয়। মা’র কাজ নেয় একটি বেসরকারী স্কুলে। যদিও বাড়ি ছেড়ে চলে আসার কারণটা তার আজও বোধগম‍্য হয়নি। মাকে কয়েকবার বলতে শুনেছেন যে বাবা বন্ধুবান্ধবদের প্ররোচনায় মদ‍্যপান করতো তাই বাবা চেয়েছিল পুরনো জায়গা থেকে অনেকটা দূরে এসে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে। যদিও সুজন অবাক হয়ে দেখেছিলো বাবার মদ‍্যপানের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে মালদায় এসে। তবে কিছুটা সুমতি হয়েছিলো বাবার‌। ব‍্যবসায় মন দিয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎই একদিন দোকান থেকে বাড়িতে ফেরার পথে খুন হলেন তিনি। খুনিরা আজও ধরা পড়েনি। খুন যে নিশ্চিতভাবে হয়েছিলো তার কোনো প্রমাণ নেই। গাড়ির ধাক্কায় মৃত‍্যু হয়েছিলো সুবীরবাবুর। যদিও নমিতার ধারণা ছিলো সেটা খুন। কোনো প্রমাণ না থাকায় কেস আদালতেও ওঠেনি। অতএব খুন যদি হয়েও থাকে তাহলেও খুনিরা ধরা পড়বেনা, এটাই স্বাভাবিক। এরপর সুজন মাস্টারপিস চাকরি পেলো। তার বিয়ে হলো।নমিতাা দেবী গত হলেন হার্ট অ‍্যাটাকে। আর অবশেষে বদলি হয়ে আবার সেই হাওড়া! পুরনো পাড়াতে!
আলতো করে দরজাটায় চাপ দিলো সুজন। সুজনকে অবাক করে প্রথমবারেই দরজাটা খুলে গেল। ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো সুজন। চারিদিকে শুধু ঝুল আর ধুলো। ঘরটা প্রায় শূণ‍্য। একপাশে একটা তেলচিটে মাদুর যা তে পুরু ধুলোর আস্তরণ পড়েছে। অন‍্যদিকে একটা ছোট পায়াভাঙা টেবিল। ভাঙা পায়ের নীচে দুটো ইঁট দিয়ে সমান করার চেষ্টা করা হয়েছে টেবিলটাকে। টেবিলের ওপরে একটা ছবি। ছবিটাতে ফুঁ দিতেই ধুলোর আস্তরণ কিছুটা সরে গেল। ছবিতে তিনজন দাঁড়িয়ে রয়েছে যদিও দীর্ঘদিন হয়ে যাওয়ায় অস্পষ্ট হয়ে গেছে ছবিটা। বলে মুখগুলো ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। ছবিটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোনোর জন‍্য পা বাড়াতেই হঠাৎ করে চারিদিক যেন টলে উঠলো সুজনের চারপাশে। দু’চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে তার চোখে ভেসে উঠলো— দু’জন লোক রামুকে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তারপরেই ভেসে উঠলো বাবার লোহার রড দিয়ে রামুকে পেটানোর দৃশ‍্য‌। তারপর হঠাৎ চাপ চাপ রক্ত।
ঘুম ভেঙে গেল সুজনের। উফ্! কি একটা স্বপ্ন!! পরনের শার্টটা ঘামে ভিজে জবজব করছে।
 জামাটা খুলতে গিয়েই চক্ষু চড়কগাছ হলো সুজনের , নীল রঙের জামায় পুরু ধুলোর আস্তরণ। সে যদি ঘুমিয়েই থাকবে তাহলে এই ধুলো কোথা থেকে এলো! অবাক হয়ে ব‍্যাগে হাত দিতে গিয়ে সুজন দেখতে পেলো ব‍্যাগের ওপরে রাখা আছে ধুলোমাখা সেই ছবি! এবার রীতিমতো ভয় পেলো সুজন। তাহলে ওটা স্বপ্ন ছিলোনা! কিন্তু যদি সে অজ্ঞানই হয়ে গিয়ে থাকবে তাহলে ওকে এ ঘরে আনলো কে!
হঠাৎই খুব পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো—
“কি গো ঘুম ভাঙলো?”
চমকে উঠে সুজন পেছনে তাকালো। সন্ধ‍্যা হয়ে গেছে। অন্ধকারে কে যেন বসে রয়েছে।
“ক্ক-কে?”
“একি! ভয় পেলে নাকি সুবুদা? আমি রামু।“
“রা-রামু। তুইই এখানে?”
“আরে আমি কানাঘুষোয় শুনলুম তুমি এখানে এসেছ। তাই দেখা করতে এলাম। তো এসে দেখি ঘরদোর খোলা। তুমি নেই। খুঁজতে খুঁজতে দেখি ছোটবেলায় আমি যে ঘরে থাকতাম তার মেঝেতে তুমি শুয়ে আছো। তো আমিই তুলে নিয়ে এলাম এঘরে।“
“ওহ! তাই বল! যা ভয় ধরিয়েছিলি!”
“কিন্তু তুমি ওঘরে শুয়েছিলে কেন সুবুদা?”
“আ-আমি! ওই এমনি। মাথাটা ঘুরে গেছিলো একটু।“
মোড়ের দোকান থেকে আনা চপ আর মুড়ি খেয়ে দু’জনে জুত করে এসে বসলো।
একটা সিগারেট ধরিয়ে সুজন জিজ্ঞেস করলো—
“কি করছিস এখন বল?”
“ওই টুকটাক। চলে যাচ্ছে একরকম।“ বললো রামু।
“আচ্ছা, সেদিন বাবার হাতে মার খাওয়ায় পর দুটো লোক তোকে কোথায় নিয়ে গেছিল যে?”
“কোথাও না। দু’একটা চড়থাপ্পড় মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিলো।“
“তোকে তো তারপরে দেখিনি আর!”
“দেখবে কি করে, দু’দিন পরেই তো পালিয়ে গেলে।“
“দ‍্যুৎ! পালাবো কেন! বাবা ব‍্যবসা করার জন‍্য আমাদের নিয়ে মালদা গেছিলেন।“
“হা হা হা হা!” ঘর কাঁপিয়ে হাসলো রামু।“তোমাদের তো তাই বলবেই।“
“কি বলছিস! আমাদের তা বলবেই মানে?”
“মানে? মানে হলো খুনের কথা কি কেউ স্বীকার করে!!”
“খুন! আমার বাবা খুন করেছে!”
“মানে নিজের হাতে নয় আর কি! লোক দিয়ে!”
“কিন্তু কাকে! আর তুইই বা এত জানলি কি করে!”
“দুটো প্রশ্নের উত্তর একটাই!”
“মা-মানে?”
“মানে খুনটা আমাকেই করা হয়েছিলো।“
“কি ব্-বলছিস!”
“হ‍্যাঁ। সেদিন তোমার বাবাকে আমি গয়নাগুলো চুরি করতে দেখে ফেলেছিলাম। তোমার বাবা আমাকে বলেছিল কথাগুলো কাউকে বললে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি ভয়ে চুপ করে ছিলাম। কিন্তু কদিন পর যখন তোমার মা আবিস্কার করলো গয়না চুরি গেছে তখন তোমার বাবা নিজের ওপর থেকে সন্দেহ দূর করতে আমাকেই চোর বলে দাবী করলো এবং তারপরের ঘটনা তুমি জানো।“
“কিন্তু এর সাথে খুনের সম্পর্ক কি! আর তুই তো দিব‍্যি বেঁচে আছিস।“
“তোমার বাবা চেয়েছিলো প্রমাণ বিলোপ করতে। তাই ওই রমণ আর জগাকে দিয়ে আমায় খুন করালো। ওদেরকে আগেই বলা ছিলো বাড়ির কাছে থাকতে। তোমার বাবা জানতো সেদিন তোমার মা আলমারী খুলবে কারণ সেদিন তোমার পাশের পাড়ায় বিয়ের নেমন্তন্ন ছিলো। মনে পড়ছে!”
“কিন্তু তুই যে বললি ওরা তোকে চড়থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দিয়েছিলো!!!!!”
“এমনি বলেছিলাম। নাহলে তুমি ভয়টা আরো বেশি পেতে। ওরা আমাকে পেছনের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে মেরেছিলো। তারপর জারুল গাছটার নীচে পুঁতে দিয়েছিলো সেদিন।“
“আ-আমি বিশ্বাস করিনা। তু-ত্তু-তুই নিশ্চয়ই মজা করছিস!”
“না গো! আমি মজা করছিনা। আমি তোমাকেই কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম সুবুদা। নাহলে আমি মুক্তি পেতাম না। এখন আমি মুক্ত। এই বাড়িতে একমাত্র তুমিই আমায় ভালোবাসতে চাই তোমাকেই সব জানিয়ে যাচ্ছি। আর তুমি দেখতে চাও আমি কিভাবে খুন হয়েছি! এই দেখো তবে!”
আবার মাথাটা টলে উঠলো সুজনের। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে বাড়ির পেছনের জঙ্গল। ওই তো দুজন লোক রামুকে মাটিতে ফেলে দিলো। ওটা কি! হাসুয়া! তা দিয়ে অনবরত কোপ দিতে লাগলো রামুর গলায়, হাতে, পায়ে। মুখের মধ‍্যে গুঁজে দিলো একটা বড়ো ইঁটের টুকরো ফলে চিৎকার করতে পারলোনা রামু। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে….. রক্ত আর রক্ত….  .
মুক্তি
————-_
সকাল থেকেই বাড়িতে কাজে লেগেছে রঙের লোক। নতুন করে রঙ হচ্ছে বাড়িটা‌।
বাড়ির নতুন নাম দিয়েছে সুজন। রামেন্দ্র ভবন। রামুর ভালো নাম ছিলো রামেন্দ্র।
সেই রাতের পর আরো দু’দিন কাটিয়েছে এখানে সুজন। রামু আর আসেনি। এবার সমস্তটা স্পষ্ট।
সেই রামণ আর জগাকে দিয়ে রামুকে খুন করার পর তাদের পাওনা টাকা না দিয়েই পালিয়েছিলো সুবীর বাবু অর্থাৎ সুজনের বাবা। সেই চুরি করা গয়নার টাকায় শুরু করেছিলো ব‍্যবসা। রামুকে সরিয়ে দেওয়ায় স্বভাবতই মা আর গয়নার খোঁজ করেনি কারণ মা জানতো যে রামু পালিয়ে গেছে। আর গয়না পাওয়ার আশা নেই।
শুধু জানতো না সর্ষের মধ‍্যেই ভূত লুকিয়ে আছে। সম্ভবত সেই রামণ আর জগাই সুবীরবাবুকে গাড়ি ধাক্কা দিয়ে খুন করেছিলো কারণ সুবীরবাবু টাকা দিতে কোনোক্রমেই রাজি ছিলেন না। উল্টে তাদেরকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিল। রামণ আর জগা নিশ্চয়ই বোকা। তারা ভেবেই দেখেনি যে তাদের ফাঁসাতে গেলে সুবীর বাবু নিজেও ফেঁসে যাবে।
রঙের প্রলেপ পড়ে হেসে ওটা বাড়িটির দিকে তাকিয়ে সুজন ভাবছিলো–পৃথিবীতে আমরা যাদেরকে দোষী বলে জানি শুধু কি তারাই দোষী হয়, নাকি পেছনে থাকে মুখোশ পরা অসংখ‍্য মুখ যাদের কারবারটাই দোষ নিয়ে!
3.3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Bishal Maitra
Bishal Maitra
2 months ago

Wow amezing story…..

TUSHAR
TUSHAR
2 months ago

Bah khub e sundor…..