নতুন জামা (NOTUN JAMA) | Bibek Ray

সকাল থেকেই আজকে আকাশটা ভারী হয়ে আছে ,কখন যে বৃষ্টি নামবে বোঝা মুশকিল । অশ্বিন মাসেও প্রায় বৃষ্টি হয়েই থাকে। পুজোর কেনাকাটা কিন্ত এই বলে থেমে থাকেনা । বাজারের রাস্তায় এসময় পা রাখার মতন জায়গা পাওয়াই যায় না । গতরাতের পান্তাভাতটুকু মুখে নিয়ে সেই সকাল নয়টায় রিক্সাটি নিয়ে গোকুল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে । এখন পর্যন্ত একটিমাত্র ভাড়া খেটে রিকশা নিয়ে বসে আছে চাতক পাখির মতো বাজারের সামনে রাস্তাটায় আরো কিছু উপার্জনের আশায় । বর্তমানে শহরের লোকেদের প্রায় ঘরে ঘরে মোটরগাড়ি, তাতেই যাতায়াত করে । মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মানুষ রিক্সা ব্যবহার করেন । তাও এখন ওই ইলেকট্রনিক ব্যাটারি চালিত টোটো গুলো আসায় গোকুলের মত রিক্সা চালকদের ব্যবসায় টান পরে গেছে । হাজার ইচ্ছে থাকলেও তার ওই টোটো কেনার ক্ষমতা নেই । বাধ্য হয়েই দিনে পঞ্চাশ-ষাট টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় । তার বউ কয়েকটা বাড়িতে ঝিঁ এর কাজ করে । এভাবেই শহরের পাশের বস্তিতে একটি ছোট্ট ঘরে তাদের দিন পার হয়ে যায় । সংসারে আর আছে তাদের একমাত্র আশা , তাদের বছর পাঁচের ছেলে কিগান । ভারী মিষ্টি ছেলেটি , চোখ দুটোর দিকে তাকালে অজান্তেই কেমন মায়া হয়ে যায় । গতকাল রাতেরবেলাতেই তো কিগান তার বাবার কাছে বায়না ধরলো পুজোয় নতুন জামা কিনে দেওয়ার জন্যে । “আচ্ছা বাবু কালকে রাত্রে এনে দেবো” বলে কোনোরকমে সান্তনা দিয়ে ছেলেকে ঘুম পারিয়ে দেয় গোকুল । কিন্তু নিজে আর শান্ত হতে পারলো না । এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরোয় সংসারে তারপর নতুন জামা ! এদিকে ছেলেকেও কথা দিয়েছে সে । যাই হোক সকালে বেরিয়ে ভালো করে রোজগার করে একটা জামা কিনতেই হবে ছেলের জন্য তাকে । এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল গোকুল ।

না:! আর মনে হয়না এখানে যাত্রী পাওয়া যাবে , এর থেকে স্টেশনের কাছে গেলেই হয়ত যাত্রী পাওয়া যাবে । পুজোর সময় সকল বাঙালিরাই তো ঘরে ফিরবে এসময় । গোকুল এসব ভেবে চলতে শুরু করল স্টেশনের দিকে । পকেট থেকে পুরোনো কাঁচ ভাঙা হাতঘড়িটায় সময় দেখে নিলো একবার । বেলা সাড়ে বারোটার ট্রেন আসবে এসময় । পা চালিয়ে প্যাডেল করে রিক্সা নিয়ে ছুটল সে ।
স্টেশনের স্ট্যান্ড এর কাছে যেতেই গোকুল থতমত খেয়ে গেলো । সমস্ত স্ট্যান্ড জুড়ে টোটো আর রিক্সায় ভর্তি । গোকুল এদিক ওদিক দেখে স্ট্যান্ড থেকে সামান্য দূরে একটা চা এর দোকানের পাশে ফাঁকা জায়গা পেলো , কিন্ত যাত্রীরা কি এতটাদুরে তাকে দেখতে পাবে ! যাইহোক সে ওখানে গিয়ে দাঁড়ালো । পকেট থেকে আগেরদিন আর আজকে সকালের আয় করা টাকা গুলো বের করে হিসেব করে দেখে মাত্র নব্বই টাকা আছে। ছেলের জন্য ভালো জামা কিনতে এখন আরো একশো টাকা পেলে ভালো হতো । এসব ভেবে তাড়াতাড়ি টাকাগুলো পকেটে রেখে স্টেশনের গেটে চোখ রাখে সে যাত্রীর খোঁজে । কিন্ত ঘন্টাখানেক পেরিয়েও কোনো যাত্রী সে পেলো না । মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে বারবার। মুহূর্তের মধ্যে তখনই নেমে এলো মুশলধারায় বৃষ্টি । যে যেখানে পারে ছুটে পালালো বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয়ের খোঁজে । গোকুল পালালো না , সে রিকশা নিয়ে সেভাবেই বসে থাকলো, যেভাবে আগে সে ছিলো । মাথার উপর থেকে অবিরত তীক্ষ্ণ ধারায় বৃষ্টির জল পরে চলেছে , সাথে তার দুই চোখ দিয়েও অশ্রু বইছে । সে অশ্রু কারো নজরে পড়বে না । কারণ তা বৃষ্টির জলের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে , গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে । সে খালি ভাবছে তার অসামর্থ্যের কথা , ছেলেকে দেওয়া কথা রাখতে অসমর্থ হওয়া , রাতের বেলা খাওয়ার সময় ছেলের দুটি মায়া ভরা চোখে চোখ রেখে নতুন পুজোর জামা না দিতে পারার কথা ।

বৃষ্টি থামলো বিকেলের দিকে । আবার লোকজন সাময়িক আশ্রয়গুলো থেকে বেরিয়ে যে যার গন্তব্যে চলতে শুরু করল । গোকুল সারাটা বৃষ্টিতে ভিজেছিল , বৃষ্টি থামার পর সেও রিকশা নিয়ে চলল আবার বাজারের দিকে মৃদু আশা নিয়ে । কষ্টের জেরে দুপুরের খাওয়ারটা খেতেও যায়নি বাড়িতে । সন্ধ্যার দিকে বাজারে আরো দ্বিগুন লোকের আগমন হয় । এসময় নিশ্চই সে যাত্রী পাবে । সে দাঁড়াল তার রিক্সা নিয়ে বাজারের সামনে রাস্তার ধারে ।

বৃষ্টির জন্য রাস্তায় জল জমে আছে অনেক অংশ জুড়ে । পিচের রাস্তা তবু কাদা ছড়িয়ে রয়েছে । আধ ঘন্টা পরে অবশেষে একজন পুরুষ যাত্রী পেল গোকুল । বিশাল দেহ , মুখে একটা বড়োসরো গোঁফ আছে । যাত্রীটা প্রথমেই ঝাঁঝালো গলায় ,” কি হে রিক্সা , যাবে নাকি ?” গোকুল একটু থতমত খেয়ে গেল প্রথমে । বলল ,” হ্যা বাবু যাবো , বলুন কোথায় যাবেন !” উত্তর এলো , ” পুরোনো হাসপাতালের কাছে যাবো , আর কুড়ি টাকা দেবো । যেতে হলে চলো নাহলে অন্য রিকশা দেখছি ।” বিনা বাক্য ব্যয় করে সে নিয়ে চলল যাত্রীটিকে , কুড়িটা টাকা তো সে পাবে । মিনিট দশেক পর গন্তব্যে ঠিকঠাক পৌঁছে দিল গোকুল ব্যক্তিটাকে । রিক্সা থেকে নামার পর লোকটি গোকুলের হাতে একটা দশ টাকার নোট ও পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে চলে যেতে লাগলো , গোকুল তৎক্ষণাৎ পয়সা গুনে নিয়ে বুঝতে পেরে বলে ওঠে ,”ও বাবু এ যে পনেরো টাকা দিলেন , আর পাঁচটা টাকা কই ?” লোকটা পেছন না ফিরেই বলে ওঠে ,”যা দিয়েছি ওতেই খুশি থাক , ঝামেলা করিসনা , পালা ।” গোকুল হতভম্ব হয়ে যায় , সে তাড়াতাড়ি রিকশা থেকে নেমে লোকটির কাছে ছুটে যায় পাওনা টাকা নিতে । লোকটা গায়ের জোরে এমন ভাবে গোকুলকে ধাক্কা মারে যে গোকুল ছিটকে পড়ে যায় রাস্তায় জমে থাকা জলের উপর । লোকটা হাসতে হাসতে চলে যায় । গোকুল আর কি করবে , রাস্তা থেকে উঠে রিকশা নিয়ে ফেরত চলে এলো বাজারে আবার । এসেই সে শুনতে পায় যে বাজারে নাকি ভিড়ের মধ্যে কোন এক লোক রাস্তায় পড়ে গিয়ে জনতার পায়ে চাপা পড়ে মারা গেছে । পুলিশ আজ রাতের জন্য বাজারের সমস্ত দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে । গোকুলের আসার পর বাজারে তেমন আর লোকের ভিড় নেই বললেই চলে । খালি পুলিশের গাড়ি , আর খবরের লোকেদের গাড়ি দেখা যাচ্ছে । গোকুলের এবার মন পুরো ভেঙে গেলো । কী কুক্ষনেই যে আজ সে ব্যবসায় বেরোলো । ছেলের জন্য জামা কেনার টাকাটাও সে কামাতে পারলো না । তার মনে পড়ল কালই তো পঞ্চমী,এবার আর তার ছেলেটা নতুন জামা পরে পাড়ার মোড়ের সেই পুজো মন্ডপে অন্য বাচ্চাদের মতো হাসবে না তাহলে ? সে কি তার নিজের সন্তানের এই সামান্য আবদার কেও পূরণ করতে পারলো না ! বাবা হিসাবে সে এতটাই অপদার্থ হলো শেষে !
রাত সাড়ে দশ টার সময় গোকুল বাড়ি ফিরে এলো।

কষ্টটা চেপে রাখা আছে স্পষ্ট বোঝা যায় তার চোখ দুটো দেখে , লাল হয়ে আছে সেগুলো , সাথে পেটে ঢেলেছে কষ্ট দূর করার অমৃত । তাই হয়ত ঠিকঠাক হাটতে পারছে না সে । কালকের আর আজকের উপার্জন করা টাকা গুলো দিয়ে সে নিজের কষ্ট টাকে কমানোর জন্য তার প্রিয় পানীয় খেয়ে এসেছে । এবার আর কোনো কষ্ট তার কিছু করতে পারবে না । বাড়ি এসে সে হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়ল । বউ এসে খেতে ডাকলে কোনো সাড়া দিলো না গোকুল । বাবার এমন রূপ দেখে কিগানও বাবার কাছে আসেনি এতক্ষন । রাত সাড়ে দশটায় আবার গোকুলের বউ ডাকতে যায় তাকে , পরমুহূর্তেই গোকুল তীব্র গর্জন করে বলে ওঠে ,” আমার খাওয়া নিয়ে তোদের চিন্তা করতে হবে না , আমি অপদার্থ , আমাকে নিয়ে না ভাবলেও হবে । তোরা খেয়ে বেঁচে থাক , আমি মরলেই তোরা সবাই সুখে থাকবি ” । কথা বলার সাথে সাথে সে তার বউকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দেয় । কিগান পাশের ঘরে ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে , কিগানের মা মেঝে থেকে উঠে চলে যায় কিগান কে নিয়ে ঘুমোতে ।
পরদিন সকালে ছেলের ডাকে ঘুম ভাঙলো গোকুলের । চোখ দুটো খুলে দেখতে পায় সে , তার ছেলে হাসি মুখে তাকে ডেকে চলেছে । গোকুল উঠে বসে । ছেলের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে বসে আছে সে । সে অবাক হয়ে আছে কারন কিগানের গায়ে আছে একটি নতুন জামা , হলদে এবং সাদা রঙে নকশা আঁকা একটি নতুন জামা । কিন্ত কিগান এটা পেলো কি করে ! সে তো সমস্ত টাকা খরচ করে ফেলেছে , তাহলে জামা কিনল কিভাবে ! গোকুল কিগানকে কিছু প্রশ্ন করার আগেই কিগান বলল ,” বাবা জামাটি খুব সুন্দর লাগছে , ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বালিশের পাশে রাখা ছিল এটি । তুমি কালকে রাত্রে রেখেছিলে বাবা ?” গোকুল কি বলবে বুঝতে পারছে না , সে কিগান কে বলল ,”তোর মা কোথায় ?” কিগান বলল ,”মা তো সকাল বেলাই কাজে চলে গেছে ।”

গোকুল কিছুক্ষণ কি চিন্তা করে ছেলেকে নিয়ে পড়ে বেরিয়ে পড়ল পুজো মন্ডপের দিকে । ছেলেকে নতুন জামা পরে কি খুশিই না দেখতে লাগছে । কিন্তু সে বুঝতে পারছেনা জামা কে দিয়ে গেল তাকে । বিকেলের দিকে প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরে এলে গোকুল দেখে তার বউও ফেরত এসেছে ততক্ষনে । কিগান পাশের ঘরে চলে গেলে গোকুল বউকে জামার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে । তার বউ বলে ,”সেদিন রাতে ছেলের আবদার আমিও শুনেছি , আমি এও জানতাম তুমি ওকে সান্তনা দিলেও নিজে সন্তষ্ট হতে পারোনি । কাল দুপুরে বাড়িতে খাওয়ার জন্য তুমি না ফিরলে বুঝতেই পেরেছিলাম আজও তোমার কামাই হয়নি , তাই নিজের জমানো টাকা কয়টা দিয়ে বাজার থেকে ওই জামাটা কিনে আনি।” কথা বলেই গোকুলের বউ চলে যায় বাইরে । গোকুল শুধু ভাবে সত্যি সন্তানের চাহিদা মেটাতে এক বাবা অসামর্থ্য থাকলেও তার মা ঠিক তা পূরণ করতে পারে । যায় হোক এবার কিগান তার নতুন জামা পেয়ে দারুন খুশি হয়েছে । সে আর চার-পাঁচটা বাচ্চাদের সাথে পুজো মন্ডপে আনন্দ করছে ।

5 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
TUSHAR
TUSHAR
5 months ago

Bah khub valo laglo pore bibek…….keep it up

Prabir sarkar
Prabir sarkar
5 months ago

এক কথাই অপূর্ব

Arghya chandra sarkar
Arghya chandra sarkar
5 months ago

Ek kothay onoboddo

Anangsha Choudhury
Anangsha Choudhury
5 months ago

সত্যিই খুব সুন্দর লিখেছিস.. ভালো লাগল

Arnab
Arnab
3 months ago

Sera bhai …..sotti ato sundar lkhe6is💖💖💖onek din por akta bhalo short story porlam…..keep it up👌👌👌👍👍👍

Bibek Ray
Bibek Ray
3 months ago
Reply to  Arnab

ধন্যবাদ