Nomborer Anatomy(নম্বরের অ্যানাটমি)| Nilodok | Bengali Story

“Everything is an art”| সেই সূত্রে নম্বর তোলাটাও একপ্রকার আর্টই বলা যায়। যদিও সেক্ষেত্রে ‘art is for our sake’ না ‘art is for our society তা বিচারের দায়িত্ব পাঠকদের ঘাড়েই তুলে দিলাম।

মার্কশিটের এক একটা নম্বরের পেছনে থাকে বিরাট ইতিহাস। যে ইতিহাসের বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রেসিডেন্সিরর মার্কামারা ইতিহাসের অধ্যাপকও ভুরু চার ইঞ্চি উচ্চতায় তুলবেন। এই এক একটা নম্বরের যে কত গুরুত্ব তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন যেকোনাে কম্পিটিটিভ এক্সামে হাইয়েস্ট নাম্বার মানেই একশাে শতাংশ চাই। যারা সেই শিখরে পৌঁছায় তাদের মানুষ বললে মানুষের সাধারন চরিত্র বিঘ্নিত হয়।

নম্বর এখন এতােটাই শুরুত্বপূর্ণ যে তা পাওয়ার জন্য মা কালীর কাছে শুধু বলিই দিতে হয়না বরং রীতিমতাে বলি হতেও হয়। খবরের কাগজের পাতায় সজাগ থাকলে , মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে ও ফল প্রকাশের পরে আপনি খুব বেশি না হলেও দু’ তিনটে করে সুইসাইড কেস নিশ্চয়ই পেয়ে যাবেন যার কারণটা হবে নম্বর।

বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা এতটাই উন্নত হয়ে পড়েছে যে নাইন্টি পারসেন্ট নম্বর দিয়েও ভালাে কলেজে এডমিশন পাওয়া যায় না , আর তারপর আই.আই.টি, আই.আই.এস এর মতাে ভালাে শিক্ষায়তন ও প্রাইভেট কোম্পানিগুলাে থেকে প্রচুর গুণধর ছাত্র ও কর্মীদের বের করে দিতে হয়। অবশ্য যেখানে ভর্তি হতে বা চাকরি পেতে নম্বর লাগে না সেসব ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বস্ত ইঞ্জিনিয়ারের তৈরি নতুন বাড়ি ভেঙে পড়া কিংবা আপনার কোনাে পরিচিত ডাক্তারবাবুর নিত্য রােগীমৃত্যু বিশেষ বিস্ময়ের ব্যাপার নয়।

দেশে বেকার সমস্যার কারণ যদি আপনি বলেন অর্থনীতি জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি তবে বলতে হয় আপনার ধারণা মােটেই ষোলাে আনা সঠিক নয়। আসলে বেকার সমস্যার সবচেয়ে বড়ো কারণ হল নম্বরস্ফীতি। কাজেই, এখন টোটোচালকের অলিখিত যােগ্যতা গ্র্যাজুয়েট হয়ে পড়েছে। আর যেখানে সামান্য টোটো চালাতেও গ্র্যাজুয়েট হতে হয় সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে বলে মানতেই হয়।

নম্বর সচেতন সৎসং অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অধিবিদ্য করে তুলতে বিষয়পিছু দু’ তিনটে গৃহশিক্ষক এবং টিউটরিয়ালে বন্দী করে দিচ্ছে। আর হিসাবটা দেখিয়ে দিচ্ছেন কত নম্বর ঘরে আনতে হবে। ফলে সেসব ছাত্ররাও ‘নম্বর জ্ঞান, নম্বর ধ্যান, নম্বর চিন্তামণি/ নম্বর বিনা ছাত্রজীবন মণিহারা ফণী’ মন্ত্রে দীক্ষিত হচ্ছে।

এরপরেই শুরু হচ্ছে পরীক্ষা হলের অধ্যায়। সেখানে পড়াশােনা না করে গেলেও পাশ করার মতাে নম্বরের অভাব হয় না। তার জন্য আছে হল কালেকশন, টুকলি ইত্যাদি নানা রকম আর্ট। এই টুকলিপ্রথা সুদূর অতীতের অজানা সময় থেকেই চলে আসছে, এ আর নতুন কি শুধু বিবর্তনের ধারায় তার ধরন বদলেছে।

টুকলির এক এক রকম পদ্ধতি এবং তার পেছনে অসীম সাধনা ও দক্ষতা সত্যিই শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। কখনাে কলমের ফাঁকে রােল করা কাগজ, কখনাে সাদা কাগজে লেখার ছাপ, আবার কখনাে প্রশ্নপত্রই পরীক্ষার ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের প্রকৃতি দর্শন করে উত্তরপত্র হয়ে ঘরে ঢােকে। আর ব্রেঞ্চে উত্তর লিখে রাখার প্রথা এখন পাতি বিষয় হয়ে গেছে। যদিও এইসব ব্যবস্থাও এখন ব্যাকডেটেড হয়ে পড়েছে। এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে টুকলিরও ডিজিটালাইজেশন ঘটেছে। তাই এখন থাকছে ক্যালকুলেটার, মােবাইল ফোন, ব্লুটুথ ইয়ারফোন, কম্পিউটারের চিপ।

টুকলির এত রকম পদ্ধতি। তাহলে বুঝুন, এক একটা নম্বরের পেছনে থাকে কত সাধনা , কত পরিশ্রম। এর উপরে একটা সুন্দর থিসিস লিখে পিএইচডি-ও লাভ করা যায়। তখন টুকলিওলঞ্জি নামে নতুন একটা স্ট্রিম তৈরি হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়।

শুধু টুকলিই নয় টুকলি কক্ষতেও আছে আয়ােজনের আড়। ছাপাখানা থেকে শুরু করে পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খােলা পর্যন্ত সবাই অবিশ্বস্ত। পরীক্ষা হলের আশেপাশে সমস্ত জেরক্সের দোকান বন্ধ, পুলিশের লেফট রাইট। আধুনিক প্রযুক্তি ঠেকাতে পরীক্ষার্থীকে প্রায় জামাকাপড় খুলিয়ে সার্চ করা। কয়েক বছর আগে দক্ষিণ ভারতের এক রাজ্যে মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষা হলে এক ছাত্রীকে আটকে দেওয়া হয়েছিল। অপরাধ, মেটাল ডিটেক্টরে জানা গেছে, তার অন্তর্বাসে এক ধাতব হুক আছ। শেষ পর্যন্ত তাকে কাপড় বদলে তারপর পরীক্ষা দিতে হয়। এরপরেও যারা টুকলিনির্ভরভাবে পরীক্ষা দিয়ে চলে, ধরা না পড়লে তাদের প্রতিভা সত্যিই প্রশংসনীয়। সাধে কি আর বলে, ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা’। একবার এক কলেজে একদল ছাত্র, প্রেসিডেন্টের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল যে, জনৈক এক প্রফেসর পরীক্ষা হলে প্রচন্ড কড়া গার্ড দেন। পরােক্ষভাবে তাদের দাবিটা কী না, তাদের টুকলি করতে দিতে হবে।

বলতে খারাপ লাগে, কখনাে কখনাে শিক্ষকরাই এক ছাত্রের হয়ে অন্য ছাত্রকে বলেন, অ্যাই, পরীক্ষার সময় ওকে একটু সাহায্য করিস তাে, একটু বলে-টলে দিস। আবার কখনাে শিক্ষকরা সক্রিয়ভাবেই পড়ুয়াদের টুকলিতে সাহায্য করেন। এক বিখ্যাত বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় প্রধান শিক্ষক মহাশয়ই সুকৌশলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে অন্যান্য শিক্ষকদের সাহায্যে তার উত্তর পত্র তৈরী করে তা তাঁদের এক অগ্রগণ্য ছাত্রের কাছে পরীক্ষা শুরুর এক ঘন্টা আগে পৌঁছে দিতেন বলে জানা গিয়েছিল। শুধুমাত্র ভালাে নম্বরের আশায়। ফলে তার মাশুল দিতে হয় শিক্ষকদের সাথে সাথে ছাত্রটিকেও।

কখনাে টুকলি কখলে প্রশাসনও কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে। আর তখন দেখা গেছে নানা বিভ্রাট। উত্তর প্রদেশ সরকারের শিক্ষা বিভাগ নকলের বিরুদ্ধে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়ায় সেবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী।

আসলে সামান্য নম্বরই যখন হয়ে দাঁড়ায় মানুষের যােগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি তখন এমন সব ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক। নম্বরের অ্যানাটমিটা যদি হয় এমন, তবে নম্বর কি সত্যিই কারও যােগ্যতা বিচারের ক্ষমতা রাখে?

বিজ্ঞানের অগ্রগতির দৌড়ে যদি কখনাে সম্ভব হয় এবং সমাজের অধিপতিরা যদি কখনাে সম্মতি দেন তবে এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার হলে, যা মাথার উপর ধরতেই কারও জ্ঞানের পরিমাণ বলে দিতে পারবে, সেই বুদ্ধি পরিমাপক যন্ত্রই হবে যােগ্যতার শ্রেষ্ঠ বিচারক। পরীক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে অনেক অগ্রগণ্য।

4 4 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
RAHUL
RAHUL
8 months ago

Kothay bidroho a6e bango a6r sob thik e kintu chach ta aro better hole valo hoto…..best of luck

Arnab
Arnab
7 months ago

Khub bhalo….darun laglo👍👍

Bishal Maitra
Bishal Maitra
7 months ago

হ্যাঁ ভালোই লিখেছে