বিভীষিকার অন্তরালে (Bibhishikar Antorale) | Prakash Sarkar

রবিবার সকালটায় নিদ্রা দেবীর আরাধনায় বেশ কিছুক্ষন মত্ত থাকব…..তা কাল রাত্রেই ঠিক করে রেখেছিলাম, কিন্তু সে আরাধনায় প্রথম ব্যাঘাত ঘটালো  আমার বাড়ির গলির একদল কুকুর।  বিছানায় এদিক ওদিক করে শেষে ঘুমটা আর এলো না দেখে অগত্যা বিছানাটা ছাড়তে হলো।  বিছানা ছেড়ে ব্রাশ করতে করতে ছাদে গিয়ে দেখলাম পাড়ার মোড়ে বেশ ভিড় জমেছে।  কৌতুহল বিশেষ কিছু জাগল না কারণ আজকাল প্রায়ই পার্টির মিটিং মিছিলের জন্য এসব লোকজনের শোরগোল দেখা যায়। তবে আজ বোধহয় ব্যাপারটা তা নয়।  কারণ লক্ষ করলাম সেই ভিড়ের মধ্যে কয়েক হাতে ঝাঁটা কোদাল বালতি  ইত্যাদি রয়েছে। ব্যাপারটা কি তা নিজে থেকেই বিভিন্ন রকমভাবে অনুমান করতে লাগলাম। বাড়ির ভেতরে আসতেই  পেপার থেকে মুখ সরিয়ে মায়ের কাছে বাবাকে জিজ্ঞেস করতে শুনলাম হ্যাঁ গো কি হয়েছে গো এত শোরগোল কিসের ? মা বলল চারিদিকে যেভাবে ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া প্রকোপ বাড়ছে সেই কারণে ছুটির দিনে সকলে মিলে পাড়ার নোংরা ও জঙ্গল পরিষ্কার করবে বলে ঠিক করেছে। বাবা শুনে বলল যাকগে পাড়া ছেলেপুলেদের এতো দিনে সুমতি হয়েছে তাহলে। এ তো ভালো কথা। এই বলে বাবা আবার পেপারে মুখ গুজলেন। হ্যাঁ সাম্প্রতিক আমাদের শহর বালুরঘাটে ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া প্রকোপ যেন বেড়েই চলেছে। পৌরসভা থেকে বিশেষ কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে যেমন পৌরসভার আবর্জনা বহনকারী গাড়ি দুবেলা এসে হুইসেল ও মাইক দিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছে।  এছাড়া বিভিন্ন আশা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে প্রতিনিয়ত প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষের স্বাস্থ্যের খবর নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির বাইরে লাগানো হয়েছে ডেঙ্গু প্রতিরোধের নিয়মাবলী। তবে এসবে মানুষের কতটা সচেতন হয়েছে তা মশার উপদ্রব থেকেই অনুমান করা যায়। ভীড়ভাট্টা আমার আর আগাগোড়াই পছন্দ নয়। তাই এ বেলাটা আর পাড়ার দিকে বের হলাম না। সকালের জলখাবার সেরে আবার বিছানায় গা টা এলিয়ে দিলাম। বেশ কয়েক সপ্তাহধরে ভাবছি সমীরণ দার বাড়িতে যাব। ঠিক করলাম আজ বিকেলে বেরিয়ে একটু নদীর দিকটা হয়ে ওর বাড়ি যাবো। সমীরন দা আমাদের পাড়াতেই থাকে।  ছেলেটি লম্বায় প্রায় 6 ফুট, মাথায় কোঁকড়া চুল, ফর্সা গোলগাল গোছের চেহারা। আর যেটা না বললেই নয় ও খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টও বটে। সকলের শুভাকাঙ্ক্ষী,একজন পর্যবেক্ষণশীল মানুষ তাছাড়া কিছু কিছু বিষয়ের উপরে যে অগাধ জ্ঞান রয়েছে তা ওর কথাবার্তাতেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। সমীরন দা আমাকে খুব স্নেহ করে কারন আমি নাকি ওর কাছে খুব ভালো শ্রোতা।  আমিও তাকে সমীহ করি। ছেলেটিকে আমার বেশ পছন্দের। তাছাড়া শুধু আমি কেন পাড়ার সকলেই ওকে বেশ ভালোবাসে। আমার মা তো ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়। সমীরনের মতো নাকি ছেলে হয় না। ওকে দেখে তোর কিছু শেখা উচিত। বায়োলজিতে অনার্স নিয়ে সমীরন দা এবছর বিএ পাস করেছে। পৈতৃক ব্যবসা কারণেই হয়তো বাইরে পড়তে যায়নি। তবে ওর একটা পাখি পোষার  উদ্ভট শখ রয়েছে। শখটা “উদ্ভব হয়েছে” কথাটা এই কারণে বলছি,  তার কারণ হলো অনেকেই তো পাখি পোষে এই যেমন টিয়া, কাকাতুয়া, ময়না, পায়রা এছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রংবেরঙের পাখি। এই সকল পাখিগুলো বহু যুগ ধরেই মানুষের সঙ্গে রয়েছে।  তাই মানুষকে এরা খুব ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তাই খুব সহজেই পোষ মানে। যেমন ওর কাছেই একবার শুনেছিলাম বেশিরভাগ তোতা পাখি নাকি পঞ্চাশটারও বেশি রকমের শব্দ করতে পারে। আবার আফ্রিকার এক ধূসর রঙের তোতা আটশোরও বেশি শব্দ অনায়াসে শিখে ফেলতে পারে। কিন্তু, ওর পাখীর কালেকশনের ধরনটা একটু ভিন্ন। যেমন বাবুই, দোয়েল, চড়ুই, শালিক, টুনটুনি ইত্যাদি আঞ্চলিক পাখির উপর ঝোক বেশি। কিন্তু, আমি ওর এই শখে বিশেষভাবে প্রভাবিত হই ওর পাখির প্রতি এহেন আশ্চর্য জ্ঞানের দখল দেখে। কোন পাখির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও জীবনযাত্রা কেমন তা ওর নখদর্পণে। একবার ওকে পাখি সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। আশা করেছিলাম ও আমাকে যাইহোক একটা বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু সে আমাকে পাখি সম্পর্কে প্রায় একটা মাঝারি রকমের প্রতিবেদন শুনিয়ে দিল।  প্রশ্ন ছিল এই যে, “আচ্ছা সমীরন দা পৃথিবীতে পাখি কোথা থেকে সৃষ্টি হল?” সে বলল “পাখি……পাখি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত পক্ষিন থেকে পক্ষী  এবং পরে তা পাখি।” এছাড়া বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে এদের ডাকা হয়।  প্রায় ষোলো কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে আবির্ভাব হয় এই জাতির. বিশেষজ্ঞদের অনুমান পাখি “থেরোপড” নামের ডাইনোসরের বংশধর।  আমি বললাম, “ডাইনোসরের বংশধর….বলো কি……” উত্তর এলো “হ্যাঁ ঠিক” যেমন করে আমরা অনেকটা শিম্পাঞ্জি গরিলাদের বংশধর। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে, পৃথিবীর বুকে প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা একটি উল্কা পিণ্ড আছেরে  পড়ায় সূর্যের আলো নিভে গিয়ে তা আমূল পরিবর্তন এনেছিল পৃথিবীর জলবায়ুতে।  স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত রকম গাছপালার ধ্বংস হওয়ার কারণে এক এক করে তৃণভোজী ও মাংসাশী ডাইনোসরগুলি খাদ্যাভাবের ফলে মারা যেতে আরম্ভ করে। কিন্তু যেসব ফলমূল শস্যবীজ মাটিতে পড়ে ছিল, তারা আবার পুনরায় জন্মাতে শুরু করে। সে কারণেই পৃথিবী আবার অন্ধকার সময় কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সেই সময় পৃথিবীর বেশিরভাগ ডাইনোসরসহ বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে গেলও দন্তবিহীন এইসব ছোট ছোট ডাইনোসর বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়। আজ বিবর্তনের ফলে তাদের এইরূপ। বিজ্ঞানীদের অনুমান আজ আমরা চারিপাশে ছোট-বড় যত রকমের পাখি দেখি তারা হলো ডাইনোসরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আমি কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। আমার তন্ময় ভাব দেখে সে আমায় বলেছিল,  কিরে কিছু বুঝলি ? আমি আশ্চর্য হয়ে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে বলেছিলাম, “হ্যাঁ।”এই হলো সমীরণ দার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। আগস্টের মাঝামাঝি সময় সূর্যের প্রখর তেজ এর কারণে দিনের বেলা স্বাচ্ছন্দে বেরোনোর উপায় নেই। তাই কথামতো দুপুরে স্নান খাওয়া সেরে রোদ পড়তেই বেরিয়ে পড়লাম বাইরে।  আমাদের এ অঞ্চলের অধিকাংশই বালি মাটি।  গাছপালার পরিমাণটাও অন্যান্য শহরের চেয়ে হয়তো একটু বেশি। এখানে প্রায় সাড়ে ছটার মধ্যে সন্ধ্যা নেমে পড়ে। তাই একটু তাড়াতাড়ি ই বেরিয়েছি। আজ নদীর তীরে পরিবেশটা সত্যিই  মনোরম। অস্তগামী সূর্যটা তার ম্লান গোধূলির আলো প্রদান করে যেন নদীর স্নিগ্ধতা বহুগুনে  বাড়িয়ে তুলেছে। ওপারে থাকা কাকের দল  স্নান সেরে কর্কশ সুরে একে অপরকে অনুসরণ করে কাকা শব্দে মাতিয়ে তুলেছে। দূরে শ্মশানের চিতাটিতে ঊর্ধ্বমুখী আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। নদীর উপরে স্থিতি মান সেতুটি উপর দিয়ে গাড়িগুলি যেন একে অপরকে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলছে ক্রমাগত। শ্রমিকরা নগর পত্তনএর কাজ শেষ করে দলবদ্ধভাবে বাড়ি ফিরছে। দক্ষিনের বাতাসও বয়ে চলেছে শিনশিন করে। এই বাতাস,  এই পরিবেশ-ই একমাত্র পারে বহু দিনের জমে থাকা ক্লান্তিকে কে নিমেষের মধ্যে মিশিয়ে দিতে।  এইসব দৃশ্য উপভোগ করতে করতে, হঠাৎ লক্ষ করলাম একটু দূরে নদীর মধ্যে একজন হাটু জলে উঁবু হয়ে শামুক খুঁজে চলেছে। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম……আরে…..এতো সমীরন দা। তার কাছে গিয়ে বললাম, “কি করছো গো সমীরণ দা ?” এবারে সে ডাঙ্গায় আসতে আসতে বলে উঠলো আরে তুষার তুই এখানে। আমি বললাম, হ্যাঁ তোমার বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলাম ভাবলাম নদীতে একটু ঘুরেই আসি। আমার হাতে শামুকের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে সে হাত পা ধুতে ধুতে বলল, “তা বেশতো চলনা তোকে দুজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো।” আমি একটু হাসির সুরেই জিজ্ঞাসা করলাম, “পরিচয়……কার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে?” -“আরে বাড়িতে নতুন অতিথিরা এসেছে যে। তাদের জন্যই তো এত আয়োজন।” 

এবার ব্যাপারটা খানিক পরিস্কার হলো। নিশ্চয়ই ওর কালেকশনে নতুন কোন পাখি যোগ হয়েছে।  দুজনে এবার নদীর তীর ছেড়ে বাঁধের উপরে এসে গেছি। আমি বললাম, “সমীরন দা অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলবো ভাবছি।” সে বলল,  “হ্যাঁ বল না।”

-“বলছি তুমিতো পাখিপ্রেমী তবে ওদের স্বাধীনতা ভঙ্গ করে তুমি ওদের খাঁচায় রেখে দাও কেন?”ও আমায় বলল, “স্বাধীনতায় ব্যাঘাত ঘটে তা কথাটা মন্দ বলিসনি কিন্তু আমি তাদের ভালবাসি। আর এটা আমার শখ।” -“শখ কিন্তু…..!!” 

সে আমায় চুপ করিয়ে দিয়ে বলল,  “তুই আর শখের কি বুঝবি রে……আজ পর্যন্ত একটা চারাগাছও লাগিয়েছিস নিজের হাতে।” কথাটা শুনে আমার বেশ রাগ হল। পথে আর একটাও কথা বললাম না। শুধু মনে মনে ভাবলাম হ্যাঁ আমি একটা চারা গাছ লাগাই নি ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রাণীর স্বাধীনতাতো কেরে নেইনি……ভালোই যদি বাসো তবে পাখিগুলোকে বদ্ধ করে রেখেছো কেন?  ভালোবাসা তো মুক্ত একের সুখেই তো অন্যজনের সুখ। এসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছলাম সমীরণ দার বাড়িতে। বাড়িটি দোতলা বাড়ির উপরতলায় ওরা থাকে এবং নীচতলায় ওর সাধের পক্ষীশালা। বাড়ির সামনে টা বড় বারান্দা যুক্ত খোলামেলা প্লেস। পিছনটা আবার বেশ জঙ্গল। ওর পক্ষীশালাই ঢুকে দেখলাম। খাচার ভেতর একটা নতুন সাদা রঙ বিশিষ্ট একটি পাখি। পাখিটি বেশ বড় অদ্ভুত দুটি ঠোঁটের অধিকারী। প্রায় দশ থেকে বারো সেন্টিমিটার এই ঠোটদুটিতে বেশ জোর যে  আছে তা নিঃসন্দেহেই অনুমান করা যায়।  পাখিটিকে আমি আগ্রহের সঙ্গে দেখছি দেখে সমীরন দা ঘরে প্রবেশ করে বলল, “এই হল সেই অতিথি।” বলে পাখির খাঁচার ভেতরে নদী থেকে তুলে আনা চার-পাচটা বড় বড় শামুক ছুড়ে দিল।  পাখিটি তার শক্ত ঠোঁট জোড়া দিয়ে এক চাপ দিতেই নিমেষে শামুকটি টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং স্পষ্টতই সে সেটিকে সবার করে নিলো।  আমি বললাম, “কি পাখি গো সমীরন দা খুব সুন্দর দেখতে তো।” ওর নাম হলো এশিয়ান “ওপেন বিলস্টক” বা “শামুকখোল” পাখি। আমি বললাম, “আচ্ছা…..এই পাখির বিশেষত্ব কী?” সমীরন দা বললো, “বিশেষত্ব তেমন কিছু না থাকলেও, এই পাখি আমাদের রাজ্যের তথা দেশের মাথায় নতুন তকমার পালক যোগ করেছে।”-“কী করে?”

-“আমাদের পাশের জেলা উত্তর দিনাজপুরে রায়গঞ্জের কুলিক পক্ষীনিবাস এর নামটা শুনেছিস নিশ্চয়ই…..”বললাম-“হ্যা।” 

কারণ, এই পক্ষী নিবাসের পাশের হাইওয়ে দিয়ে  বেশ কয়েকবার গাড়ীতে করে গিয়েছি। কুলিক পক্ষীনিবাস হলো উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ওই প্রায়……তিনশো ষাট-সত্তর একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা বিশাল পক্ষীশালা। পাশে বয়ে চলা কুলিক নদীর নাম অনুসারে এর নাম কুলিক পক্ষী নিবাস। চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এগোলে এই ফরেস্টের বড় বড় ওয়াচ টাওয়ার গুলো চোখে পড়ে। এছাড়া ফরেস্ট সংলগ্ন জাতীয় সড়কে কিছু কিছু এলাকাকে সাইলেন্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সমীরণ দা আরও বললো যে এই মুহূর্তে নাকি কুলিকে পাখির সংখ্যা প্রায় আশি হাজারের কাছাকাছি যার মধ্যে এই শামুকখোল পাখির সংখ্যা প্রায় সাতচল্লিশ হাজার। এই পরিসংখ্যার ভিত্তিতে এশিয়ার সবচাইতে বড় শামুকখোল পাখির কলোনি বর্তমানে কুলিক পক্ষীনিবাস। এর আগের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া ছিল প্রথম স্থানে। এখন তারই স্থান দখল করেছে এই পক্ষীনিবাস। ওর কথা শেষ হলে পর ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আরেকজন অতিথির সঙ্গে পরিচয় করাবে বলে…..”  সমী দা আমায় দাঁড়াতে বলে জানালার পাশ থেকে আরেকটি খাঁচা নিয়ে এলো।  এবার যে পাখিটি আমি দেখলাম তা আমি মোটেও প্রত্যাশা করিনি। সেটা ছিল একটি কাক। এবার আমি ব্যাঙ্গ করে বললাম, তুমি কাকও পুষবে নাকি। পুষবো মানে…. আলবাদ পুষবো…..। কাক পোষবার ইচ্ছে আমার অনেকদিন থেকেই ছিল। এতদিনে তা পূর্ণ হয়েছে।  আমি বললাম, “কেন?”

সে আবার বলতে শুরু করল……..কাক…….পাখিটি হলো বিশ্বের সবচাইতে চালাক পাখিদের মধ্যে অন্যতম পৃথিবীতে মানুষের পর শিম্পাঞ্জির ও গরিলার মত সমান বুদ্ধিমান প্রাণী হল কাক। কাকের জ্বালায় সবচেয়ে বেশি ভুগেছিল পূর্ব আফ্রিকার জাঞ্জিবার প্রদেশ। প্রায় এক কোটি তিরিশ লক্ষ ভারতীয় কাক সেখানে বসবাস করে। এরা ছিল যেমন ধূর্ত তেমনি সাহসী। বললাম, “ভারতীয় কাক কেন?” 

সে বলল-“দেখ আশির দশকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্রিটিশ কলোনী ছিল ভারতবর্ষ। জাঞ্জিবার কে আবর্জনা মুক্ত করার জন্য ব্রিটিশরা ভারত থেকে আমদানি করেছিল কয়েক হাজার কাক। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই পূর্ব আফ্রিকার এই প্রদেশটিতে কাকেদের সহায়তায় গড়ে ওঠে তাদের অভায়ারণ্য। ভারতীয় কাকেদের অত্যাচার এত চরম সীমায় পৌছে গেছিল যে ১৯১৭ সালে সেখানকার সরকার একে ক্ষতিকর পাখি বলে ঘোষণা করে। স্থানীয়দের শিকার করতে উৎসাহী করা হয় কারণ এই কাক গুলো দলবেঁধে প্রচুর  ফসল নষ্ট করত ও বিভিন্ন পাখির বাসায় ঢুকে তাদের তাদের ডিম ও শাবকদের খেয়ে ফেলত।  এরপর কেটে গেছে প্রায় আরও ১০০ বছর কিন্তু কোনোভাবেই এদের দমন করা যায়নি। ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রায় ১২ লক্ষ কাককে মারা হয়েছিল সেখানে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এই কাকের দল সমান পরিমাণ শাবকের জন্ম দেয়। পরিবেশবিদগণ স্বীকার করেছেন……ভারতীয় কাকেরা এতটাই চালাক ছিল যে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা খুবই মুশকিল। তবে মানুষ যদি তাদের আবর্জনা ফেলার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে তবে এদের সংখ্যা কমতে পারে।  পৃথিবীতে এরকম পাখি আর কটা আছে বল দেখি।” 

সত্যি কাক সম্পর্কে এমন কোনো ধারনাই ছিল না আমার আজ পর্যন্ত।ক্রমে বাইরে সন্ধ্যা নেমেআসছে দেখে মনে মনে বাড়িতে যাবার উপক্রম করছি, ঠিক এমন সময়ে ঘরের অন্ধকারছন্ন এক কোনে হটাৎ করে চোখ  পড়ায় দেখলাম খাঁচায় একটা কালো পাখির মতন কিছু একটা গুটিসুটি মেরে রয়েছে। সমীরণ দা এতক্ষণ আমার দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি।  আমি খাচাটার দিকে এগোতে এগোতে বললাম,  “এটা কি পাখি গো সমীদা?”সমীরন দা দ্রুত এগিয়ে এসে প্রায় অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “ও ওটা, ওটা তেমন কিছু নয়….”

স্পষ্টতই আমি বুঝতে পারলাম সে আমার থেকে জিনিসটি আরাল করতে চাইছে। ততক্ষণে আমি খাচা টির সামনে চলে এসেছি। এবার আমি যা দেখলাম তা দেখে আমি রীতি মতন স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কারণ সেটাছিল একটা বাদুড়। এই বাদুড় প্রাণীটিকে দেখে আমার প্রথমেই মাথায় এলো ভ্যাম্পায়ার ব্যাট এর কথা। তাই আমি একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম সমীরণদার দিকে।  -“এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে?  আর খাচাতেই বা বন্ধ করে রেখেছো কেন? আমার ব্যাস্তভাব দেখে আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য সমীরণ দা বলল, “আরে কাল রাতে বাদুড়টি বাড়ির সামনে রাস্তায় ইলেকট্রিক শক খেয়ে পড়েছিল তাই ওকে পরিচর্যার জন্য নিয়ে এসেছি”

-“তোমার শখ তো নিত্যান্তই পাখি পোষা কিন্তু ও তো একটা স্তন্যপায়ী। সবচাইতে বড় ব্যাপারটা হল এরা ইবলা,হেন্দ্রা ও নিপহ এর মত প্রচুর প্রাণঘাতী ভাইরাস এর ধারক ও বাহক। তাছাড়া তুমি ওর জঘন্য রক্তপিপাসু বিভীষিকাময় চরিত্রের কথাতো জানোই গভীর রাতে যেকোনো উষ্ণ প্রাণীর দেহ থেকে অনায়াসে রক্ত পান করে জলাতঙ্ক নামক প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।” তুমি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে এক্ষুনি ওকে বিদায় করো। সঙ্গে সঙ্গে বাদুড়টি একবার চেচিয়ে উঠলো।  এতক্ষন বাদুড়টি নিঃস্পলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আমার সব কথা শুনছিলো। মনে হল আমার কথাটা  প্রাণীটির একেবারে পছন্দ হয়নি।  একইভাবে সমীরণদার মুখেরও এক অপ্রসন্ন তথা  বিরক্তির ভাব লক্ষ করলাম। সমীরণদা যথাসাদ্ধ ভাবে নিজেকে সংবরণ করে, সে বাদুড়টির দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে চেয়ে আমার বলতে লাগলো,  “দেখ তুষার আমি মানি এরা অনেক রোগ ভাইরাস বহন করে…..সব ঠিক আছে……..কিন্তু তার চেয়ে বহু গুণ উপকার করে আমাদের প্রকৃতির। বর্তমানে ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া এর প্রকোপ বাড়ছে আমরা সকলেই জানি। এই বাদুড়ই কিন্তু ঘন্টায় প্রায় ১২০০ র বেশি মশা খেয়ে নিতে সক্ষম। যা আমাদের পরিবেশের জন্য খুবই উপকারক। পরিবেশ ও অর্থনীতির দিক দিয়ে বাদুড় আমাদের অনেক উপকার করে। ফুলের পরাগমিলন ও গাছের বীজ ছড়িয়ে দিতে বা তাদের মল থেকে প্রাকৃতিক জৈব সারের যোগান দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। বাদুড় প্রাণী নিজের ওজনের সমপরিমাণ পোকা খেয়ে ফসলের বহু পরিমাণ ক্ষতি কমায়। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিকারক কীটনাশক-এর ব্যবহার কমায় এরা…….এটা কী তুই অস্বীকার করতে পারিস?”আরও বললো……. 

-“সাম্প্রতিক থাইল্যান্ডের একটি গবেষণায় জানা গেছে, বাদুড় এইসব পোকামাকড় খেয়ে প্রায় দশ লক্ষ মার্কিন ডলার এর ফসল ক্ষতির হাত থেকে বাচিয়েঁছে। সারাবিশ্বে প্রায় ১৩০০ জাতির বাদুর আছে। যার মধ্যে ১২৮ টি প্রজাতি আমাদের ভারতবর্ষে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে আটলান্টিক মহাদেশ বাদে সব মহাদেশেই এদের দেখতে পাওয়া যায়। বাদুড় একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী যারা অনেক সময় আকাশে উড়তে পারে। আর রোগজীবাণু ছড়ানোর কথা বলছিস এরা তো আর সরাসরি মানুষের মধ্যে তা ছড়ায় না। মানুষ যখনই এদের সংস্পর্শে এসেছে, তখনই মানুষের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ গুলি পাওয়া গেছে।”আমি বললাম, “আর রক্তখেকো বাদুড়ের কথা…….সেটা কি সত্যি নয়?” 

সে বলল, “আমেরিকা মহাদেশে মাত্র 3 টি প্রজাতির বাদুর আছে যারা রক্তখেকো বলে জানা যায়। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন লেখক সাহিত্যিকেরা তাদের গল্প-উপন্যাসের প্লট তৈরির খাতিরে এদের নেতিবাচক চরিত্রের রূপদান করেছে। যা আজও বিদ্যমান।”

এই কথাগুলো শোনার পর বাদুর সম্পর্কে কিছু ভুল ধারনা কাটলেও, ওর কথার ভঙ্গিটা বাদুড় সম্পর্কে বেশ পক্ষপাতিত্ব করছে বলে মনে হল। এতক্ষণে বাইরে বেশ অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। আর দেরি না করে ওকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পথে যেতে যেতে ভাবলাম বাদুড় প্রাণীটি উপকারী তাতে সন্দেহ নেই। তবে প্রথমে কেন সে আমার থেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো। আর কেনইবা প্রাণীটিকে বিদেয় করার কথা শুনে  প্রাণীটি অমন করে চেঁচিয়ে উঠলো আর তার সঙ্গে সমীরন দার মুখটাতেই বা কেন বিরক্তিভাবের ছাপ ফুটে উঠলো। এসব ভাবনা চিন্তার মধ্যে যখন বাড়িতে পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। সামনে স্কুলের টেস্ট পরীক্ষা। তাই মুখে জল দিয়ে সন্ধের স্বল্পাহার সেরে ফিজিক্স বইটি খুলে বসলাম। কিন্তু সেদিন আর কোনভাবেই পড়ায় মন বসাতে পারলাম না। সেই আশ্চর্যবোধক টি সম্পর্কে আমার কৌতুহল যেন বেড়েই চলল। ভাবতে লাগলাম ওই বাদুড় যদি সেই আমেরিকান প্রজাতির রক্তখেকো বাদুড় হয় তাহলে কি হবে? বিভিন্ন রকমের দুশ্চিন্তা মাথায় আসতে লাগলো।  তাই চিন্তা দূর করতে সেই রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।  সারাদিন অনেকটা হাঁটার ফলে শরীরটা বেশ ক্লান্ত থাকায় ঘুম আসতে বিশেষ দেরী হলো না।

হঠাৎ রাত্রে স্বপ্নে দেখছিলাম বাদুড়টি আমার ঘরে ঢুকেছে।  কিভাবে ঢুকেছে তা জানিনা। তবে এই বাদুড়টির আকার বেশ খানিকটা বড়।   এবার প্রাণীটা তার লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে আমার বুকের উপরে চেপে খুব আলতো ভাবে আমার গলার নিচে ঠিক কাধের কাছে তীক্ষ্ন দাঁত বসিয়ে সন্তর্পনে রক্ত পান করতে লাগল। আমি বাদুড়টি গলা দিয়ে ঢোক গেলার আওয়াজ অনুভব করলাম। কিন্তু একি আমার গলা দিয়ে একটু আওয়াজ বেরোচ্ছে না। কী হচ্ছে এসব। আমি তখন দেহের সকল শক্তি একত্রিত করে বাদুড়টিকে  এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে মেঝেতে গিয়ে পড়লাম।  আমার ঘুম ভেঙে গেল তৎক্ষণাৎ। বাইরে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। আমি ভয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় লোকজন মর্নিং ওয়ার্ক এর জন্য ততক্ষনে বাইরে বেরিয়েছে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। শেষটায় বেশ বুঝতে পারলাম এই বিভীষিকাময় স্বপ্নটি নিছকই আমার ক্লান্ত মনে পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাতে রক্তখেকো বাদুড় সম্পর্কে বেশি ভাবনার ফলেই এই স্বপ্নের আবির্ভাব হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। এই ঘটনার পরে কেটে গেছে প্রায় আড়াই মাস। এর মধ্যে একটি দিনের জন্যও সমীরন দার  বাড়িতে আর যাইনি। এমনকি সেই বিভীষিকাময় স্বপ্নের কথাও কাউকে বলিনি। শুধু একবার শুনেছি সমীরণ দার নাকি খুব শরীর খারাপ। সে নাকি তার সকল পাখি গুলো ছেড়ে দিয়েছে। সত্যি বলতে গেলে…..পাখিগুলোর কথা ভেবে আমি কিন্তু বেশ আনন্দই পেলাম। ভাবলাম ওর সাথে যদি একবার দেখা করে আসতে পারতাম……। ঠিক করলাম পরীক্ষাগুলো শেষ হতেই যাব ওর কাছে। আজ 15 দিনের মাথায় আমার সকল পরীক্ষা শেষ হলো। মাথাটা বেশ হালকা অনুভব করছি। শরীর ও মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে।  নভেম্বর মাস…..বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। গায়ে একটা জাম্পার পড়ে বেরিয়ে পড়লাম সমীরণদার বাড়ির দিকে। বাড়িতে ঢুকেই নীচে জেঠিমা মানে সমীরণদার মায়ের সাথে দেখা। জিজ্ঞাসা করলাম ভালো আছেন তো জেঠিমা……জেঠিমা কাতরকন্ঠে  উত্তর দিল, “আর ভালো থাকা বাবা !!”

এবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম,”শুনলাম সমীরণ দার নাকি শরীর খারাপ কেমন আছো ও এখন?” কাঁদো কাঁদো গলায় জেঠিমা আমায় বলতে লাগলো,”কি যে হয়েছে ছেলেটির আমার…..অমন সুন্দর ছেলেটি……শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কার যে কুদৃষ্টি পড়েছে আমার ছেলেটার উপর। এই বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন তিনি। আমি সমীরণদার ঘরের দিকে গেলাম। ঘরে ঢুকে দেখি ও বিছানায় শুয়ে আছে সে। সত্যি ওর ওমন পুষ্ট চেহারার মাত্র এই কয়েক মাসে এমন পরিবর্তন হতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাও কঠিন। ও আমায় দেখে মৃদু হেসে বললো ও এসেছিস তাহলে তুষার……. কিছুদিন হোলো তোর কথাই ভাবছিলাম।

বললাম,”কেন?”না অনেকদিন হলো দেখা সাক্ষাৎ নেই তাই আরকি। আমি আমার টেস্টের পরীক্ষা গুলোর কথা জানালাম। আর বললাম, “তুমি নাকি সব পাখি ছেড়ে দিয়েছো।”ও বলল, “হ্যাঁরে মুক্তি দিয়ে দিয়েছি।” -“যাইহোক আগে আমায় বলতো তোমার অসুবিধেটা কি হচ্ছে? আর ডাক্তারই বা কি বলেছে?” ও বলল ডাক্তার কি-ই বা বলবে তারা তো কোন রোগই তো ধরতে পারছে না। আমি মনে মনে ভাবলাম ডাক্তার রোগ ধরতে পারছে না……এ আবার কেমন অসুখ রে বাবা। সে আমায় বলল যাগ্গে ওসব কথা ছাড়। চল একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি। আমি বললাম হ্যাঁ বেশ তো চল। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠবার সময় ও আমায় বলল, “আজ তোকে কয়েকটা কথা বলব ভাবছি।” -“আমারও কিছু বলার আছে তোমায়।”

আজ সকাল থেকেই শিনশিন করে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ছাদে উঠতেই নাকে একটা মৃদু ভাবসা পচা গন্ধ অনুভব করলাম। গন্ধটি আসছে ওর বাড়ির পেছনে জঙ্গল থেকে। হয়তো কোন কিছু মরে পড়ে আছে। এবার সমীদা আমায় জিজ্ঞাসা করল,”বল কি বলবি বলছিলি?”আমি বললাম, “কথাটা শুনে তুমি হাসবে না আগে বলো।”বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে বল না।” 

সেদিন রাত্রে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় স্বপ্নের কথা সংক্ষেপে বলতেই লক্ষ্য করলাম ওর মুখে উদ্বেগ ও অতিবিস্ময় ভাবটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর আগে ওকে তন্ময় হয়ে এতটা ভাবতে দেখিনি কখনো…..। আমি জিজ্ঞেস করলাম,”কি ভাবছ সমীদা?” আমার কথায় কোন উত্তর পেলাম না দেখে ওকে আর বিরক্ত না করে আমি ছাদের রেলিং-এ হেলান দিয়ে নীচের দিকে চাইতে যে জিনিসটা চোখে পড়ল তা দেখে আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে শরীরের ভেতর এক অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি অনুভব করলাম। দেখলাম মাটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টি পাখির মৃতদেহ গলে পচে পড়ে আছে। গন্ধটি যে এখান থেকে আসছে তাতে আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমি কাঁপা শব্দে সমীরনদাকে প্রশ্ন করলাম, “এ আমি কি দেখছি সমী দা? পাখিগুলোর এই হাল কি করে হলো? তুমি যে বললে পাখিগুলোকে তুমি মুক্ত করে দিয়েছো?” সমীরন দা খুব শান্তভাবে বোললো, “আমিতো পাখিগুলোকে মুক্তি দিয়েছি।”

কথাটা শুনে আমার রাগে শরীর জ্বলে উঠলো। সে আমায় জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা তুষার বেশ কয়েকমাস আগে তুই আমায় বলেছিলি আমি নাকি পাখিগুলোর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছি মনে আছে?” এবার আমি ওকে বিরক্তির স্বরে বললাম,”হ্যাঁ মনে আছে।” ও আমায় বলল,”তুই ঠিকই বলেছিলিস….. আমার তখনি এদের মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।  তাহলে আজ হয়তো এই দিনটা দেখতে হতো না।  -“আমি বললাম তার মানে তুমি পাখিগুলোকে…..।”ও আমার মনের অভিব্যক্তি অনুমান করেই  আমায় থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো……..”না আমি পাখিগুলোকে মুক্ত করতে পারিনি।”-“কেন?”

-“আজ তোকে আমার সব ভয়ানক অভিজ্ঞতা কথা বলে মনের ভেতরটা হালকা করবো। এসব আর আমি এক মুহুর্ত সহ্য করতে পারছিনা। আমি এর একটা শেষ দেখতে চাই। আমার উদ্বিগ্নতা ক্রমেই বার ছিল।”আমি বললাম, “হেঁয়ালি না করে বল আমায় কি হয়েছে।”এবারে সমীরন দা বলতে শুরু করল।

-“আমি তোকে মিথ্যে বলেছিলাম। বাদুড়টিকে আমি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনিনি। আমি বললাম,”তবে?” “বাদুড়টি কে আমি প্রথমে আবিষ্কার করি আমার শোবার ঘরের ভেন্টিলেটরে। ভেবেছিলাম দিনের বেলা ভুল করে ঢুকেছে। রাত্রে বেরিয়ে না গেলে তাড়িয়ে দেবো। কিন্তু, পরপর দুদিন প্রাণীটি সেখানে ছিল। বেশ বুঝতে পারলাম এই দুদিনে বাদুড়টির প্রতি আমার সহানুভূতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে…….। প্রাণীটির করুন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার জন্য, অপত্য প্রাণীটিকে আর তাড়াতে পারলাম না। তারপর যেদিন তুই শামুকখোল পাখি থেকে দেখতে এলি, সেদিন ওকে পক্ষীশালায় প্রথম নিয়ে এলাম। পরের দিন পক্ষীশালায় ঢুকতেই দেখলাম মেঝেতে আমার ঘুঘু পাখি টি মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মৃত্যুর কোনো কারণ অনুমান করতে পারলাম না। পরদিন রাত্রি দেড়টা নাগাদ পাখিশালা থেকে আসা আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে গেল। গিয়ে দেখলাম বাদুড়টি শামুকখোল পাখিটিকে ধরে রক্ত পান করে চলেছে। পাখিটি বাঁচবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তার ডানা দুটি কে ঝাপটাতে ঝাপটাতে কিছু সময় পর পাখিটির অসার দেহ নেতিয়ে পরলো মেঝেতে। বাদুড়টির প্রতি আমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে পাখিটিকে আমি না বাঁচিয়ে সেই মৃত্যুর দৃশ্য উপভোগ করতে করতে দুর্বলতা আর ভালবাসার মধ্যে ব্যবধান খুঁজে পারছিলাম না। আমি নির্লজ্জের মত দরজা বন্ধ করে চলে এলাম। এভাবে কেটে গেছে আরও এক মাস। প্রতি রাতেই এক এক করে আমার সংগ্রহের ভালোবাসার প্রতিটি পাখিকে নৃশংস ভাবে বেদনাদায়ক মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে এই বাদুড়। এ যেন তার ও আমার এক বিরাট সুখের প্রাপ্তি। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। রোজ রাতে এ রক্ত ঝরানো নেশা আমায় ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলেছিল।”

ওর কথা শুনে আমার শরীরের প্রতিটি কোণে শিহরণ জেগে উঠছিল।এবার আমি বললাম,”পাখি তো সব শেষ এরপর?”সমীরন দা বলল, “এরপর?এরপর আজও সেই ঘটনা ব্যতিক্রম ঘটেনি।” আমি বললাম, “মানে টা কি?”

এরপর ও ঘাড়ের কাছ থেকে শার্ট টা সরিয়ে পাশাপাশি দুটো লাল বিন্দু দেখিয়ে বলল,”আজো প্রতি রাতে সে আমার ঘরে এসে রক্ত পিপাসা মেটায়।” এতক্ষণে সবটা আমার কাছে জলের মতো স্বচ্ছ।  এবারে সমীরনদাকে আমি রাগে আর সহ্য করতে পারছিলাম না তাও নিজেকে কোনোরকমে সামলে রেখেছি।তাও ঘটনার নৃশংসতা সইতে না পেরে আমি বললাম,”ছিঃ সমীরন দা তুমি এটা করতে পারলে? তোমার মত মানুষের কাছে এটা প্রত্যাশা করা যায় না। এমন জঘন্য কাজ তোমার সাজে না।”আমার কথা শুনে সমীরন দা কাতর কন্ঠে বলে উঠলো, “হ্যাঁ আমি জানি আমি  খুব বড় ভুল করেছি। যা ক্ষমার যোগ্য নয়।” কিন্তু, আমি এখন এর থেকে মুক্তি চাই। আমি বললাম মুক্তি পাবে সমীরন দা আজই মুক্তি পাবে তুমি এবার আমি ঠিক করলাম এই জঘন্য প্রাণীটিকে আর ইহলোকে থাকতে দেওয়া চলে না। আমি বললাম, “এসো আমার সাথে।” দরজায় কপাট লাগানো একটি কাঠের পাশর নিয়ে ছুটে চললাম পক্ষীশালার দিকে। সমীরনদাও চললো আমার পিছু পিছু।  সজোরে দরজাটি খুলতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বাদুড়টি  এই দেওয়াল থেকে ওই  দেওয়াল ছুটোছুটি করতে লাগলো। আমার হাতে থাকা কাঠের অস্ত্রটি দিয়ে যেইনা প্রহার করতে যাব,  অন্ধকারে একটা টেবিলের কোনে বেঁধে আমি পড়ে যেতেই অস্ত্রটি ছিটকে পড়ল মেঝেতে। এবার দেখলাম ডানা ছড়িয়ে বাদুড়টি ভয়ঙ্কর আক্রমনাত্মক আকার ধারণ করেছে। পুনরায় সেই বিভীষিকাময় আতঙ্ক আমায় আঁকড়ে ধরে শরীরটা অসাড় করে দিয়েছে। স্বপ্নে দেখা সেই লুলুভো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যেই না আমার দিকে ছো মেরেছে অমনি বিদ্যুৎবেগে সমী দা ঘরের আলো জ্বালাতেই বাদুড়টি দিকভ্রষ্ট হল এবং সেই কাঠটি দিয়ে বাদুরটির শরীরে স্বজোরে আঘাত করতেই বাদুড়টি পাশের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে মেঝেতে পরে যন্ত্রনায় ছটফট করতে লাগলো। আমি তখনো মেঝেতেই পড়ে আছি। সমীরণ দা এগিয়ে গিয়ে এক দুই তিন চার…….কতবার যে প্রহার করলো তা আমি জানিনা। এইসব দৃশ্য দেখে আমি ভয় ছুটে কোনোমতে পালালাম বাড়ির দিকে। বাড়িতে পৌঁছে উঠোনে জ্ঞান হারালাম। তারপর আর কিছুই মনে নেই পরদিন সকালে চোখ খুলে দেখলাম বাবা-মা দুজনেই আমার পাশে এসে বসে আছে। 

সেদিনের সেই নারকীয় বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা আজও সমীদা ছাড়া সকলেরই অজ্ঞাত………

5 5 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
TUSHAR
TUSHAR
6 months ago

Seriously an amezing story…..
Vampire bat er chinta ta durdhorsho…..

aniket
aniket
6 months ago

Sera golpo……